মালফুযাত সংকলন-৬

মসজিদে আযান আর নামায

মসজিদে মাগরিবের পর হযরতের বয়ান শুরু হয়েছে। এশার আযানের কিছুক্ষণ পূর্বে বয়ান শেষ হল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন এসেছেন হযরতের বয়ান শোনার জন্য। হযরত বয়ান শেষ করেই বললেন, ‘যারা কাজে দূরে কোথাও যাবেন অথবা অন্য কোন মসজিদে নামায পড়বেন, তারা এখনই চলে যান। কেননা আযান হয়ে গেলে আদব হচ্ছে  সেই মসজিদেই নামায পড়ে নেয়া।’

পর্দা

একবার কনে দেখতে গিয়ে এক ছেলের বাবা হবু বউয়ের হাতে আংটি পরিয়েছেন। হযরত এই ঘটনায় বলেন, ‘যেহেতু এখনো বিয়ে হয়নি, ছেলের বাবা এই মেয়ের জন্য মাহরাম না। সুতরাং এটা কি করে জায়েয হতে পারে?’ অর্থাৎ ছেলের বাবার কাজটি ঠিক হয়নি। হবু বউয়ের সাথে এখনো পর্দা করতে হবে। বিয়ে হয়ে গেলে ভিন্ন কথা।

নেয়ামতের শোকর

একবার বিজলী চলে গেলে হযরত إِنَّا للهِ وَإنَّا إلَيهِ رَاجِعُونَ পড়লেন। তারপর বলেন, ‘এতক্ষণ বিজলী ছিল, তাই আল−াহ তা’আলার শোকর হিসাবে  الْحَمْدُ لِلَّهপড়া উচিত ছিল। আমরা নেয়ামত থাকতে শোকর আদায় করি না।’

জানাজার নামাযের সুন্নাত

হযরত বলেন, ‘আজ এক মসজিদে মাগরিবের নামায পড়েছি। ফরয নামাযের পর মাইকে জানাজার নামাযের ঘোষণা করা হল। বলা হল দু রাকাত সুন্নাত নামায পড়ে নেন। তারপর মসজিদের বাইরের খোলা চত্বরে জানাজার নামায পড়া হবে। আমরা জানাজার নামায পড়লাম। আজকাল হাজার হাজার মসজিদে জানাজার নামায হয় মসজিদের ভিতরে। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কত বছর ধরে মসজিদের ভিতর জানাজার নামায পড়ছো, আজ কেন বাইরে পড়লে? বলা হল, ইমাম গাহেব বলেছেন, ‘আপনারা কি চান না, রাসূলের সুন্নাত জিন্দা হোক?

ঠেকায় মসজিদের ভিতর জানাজার নামায পড়া যায়। এটা জায়েয। কিন্তু উত্তম না।

অনেকে হয়তো বলবে মসজিদের ভিতর কাতারে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এখন বাইরে যাও, জুতা নাও, আবার কাতার সোজা কর। কত সময় গেল! ঈদের জামাত ঈদগাহে পড়া সুন্নাত নাকি মসজিদে পড়া? বহু জায়গায় ঝগড়া হয়, মৌলবীরা খালি বাড়াবাড়ি করেন। আপনি কিসের জন্য জানাজার নামায পড়েন? যদি আল্লাহ’র সন্তুষ্টির জন্য পড়েন তবে তো রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী পড়তে হবে। ইসলামে এই বিষয়টা ঈষবধৎষু উবভরহবফ। নবী করীম  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

بَدَأَالْاِسْلَامُ غَرِيْبَا فَسَيَعُوْدُ كَمَابَدَأَ  فَطُوْبٰى لِلْغُرَ بَاءِ

هُمُ الَّذِيْنَ يُصْلِحُوْنَ مَااَفْسَدَ النَّاسَ مِنْ بَّعْدِ مِنْ سُنَّتِىْ

‘ইসলাম তার যাত্রা শুরু করেছে আগন্তুক হিসাবে। আবার শীঘ্রই আগের মত হয়ে যাবে। আগন্তুকদের জন্য খোশখবরী। এরা ঐ সকল লোক যারা আমার সুন্নাতগুলো মিটে যাবার পর আবার তা জিন্দা করে।’ এই মসজিদে কত হাই অফিসিয়াল নামায পড়ছে। কিন্তু জানাজার নামায মাঠে পড়তে হবে, এটা কেউ সংশোধন করতে আসে নাই।

কুরআন শুদ্ধ করে পড়া 

হযরত বলেন, ‘হরদুঈ হযরত রহমাতুল্লাহি  আলাইহি বলতেন, ‘কুরআন শুদ্ধ করে পড়া সবচেয়ে বড় সুন্নাত’। অথচ আজ এই বিষয়ে আমাদের অবহেলার শেষ নেই। ‘মাকান বাড়হিয়া, পান বাড়হিয়া, নান বি বড়হিয়া, কুরআন ঘাটিয়া।’ অর্থাৎ, তোমার ঘর উত্তম, খাদ্য উত্তম, পানীয় উত্তম। কিন্তু কুরআন পড়া অনুত্তম।’

মসজিদে ঢোকার পাঁচটি সুন্নাত

হযরত বলেন, ‘মদীনা শরীফে একজন ছাত্র আমাকে দেখালেন মসজিদে নববীতে বাবুস সালাম দিয়ে ঢুকতে মসজিদে ঢোকার পাঁচটি সুন্নাত লেখা আছে। বিসমিল্লাহ পড়া, ডান পায়ে প্রবেশ করা, দরূদ শরীফ পড়া, মসজিদে ঢোকার দু’আ পড়া এবং ইতিকাফের নিয়ত করা।’

দুই চাকা

হযরত বলেন, ‘১৯৮০ সালে হজের সফরে একজন হাজী সাহেব (যিনি হাফেজ্জী হুযুুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির খুব আর্থিক খেদমত করতেন) আর আমি মক্কা শরীফে হাফেজ্জী হুযুুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির সাথে ছিলাম। হযরত হাফেজ্জী হুযুুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি হরদুঈ হযরত এবং তার খলীফা হযরত হাকীম আখতার সাহেব দামাত বরাকাতুহুমকে বাংলাদেশে আসার দাওয়াত দিলেন। হরদুঈ হযরত তা কবুল করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হাজী সাহেব মওকা পেয়ে নিজ থেকে বলে উঠলেন, ‘হুযুুর! আপনার এই মেহমানদের একজনকে ভারত, অন্যজনকে পাকিস্তান থেকে আনা নেয়ার সব খরচ আমি বহন করব।’ কাবা ঘর সামনে। কি অদ্ভুত খেদমতের সুযোগটা সেই হাজী গাহেব নিলেন। হযরত হাফেজ্জী হুযুুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন- দ্বীনের গাড়ির দুইটি চাকা। এক. আলেমদের প্রচেষ্টা, অন্যটা পয়সাওয়ালাদের মাল।

সালাম

হযরত বলেন, ‘মক্কাশরীফে হরদুঈ হযরতের সাথে দেখা করতে গেলাম। সালাম আস্তে দিলাম। হরদুঈ হযরত বললেন, ‘নিকালিয়ে! দোবারা সালাম কারকে আইয়ে!’ সুতরাং ঘর থেকে বের হয়ে জোরে পরিষ্কারভাবে সালাম দিলাম। এবার হযরত ঘরে ঢোকার অনুমতি দিলেন।’

ছবি

হযরত বলেন, ‘সেদিন এক ছাত্র এসে বললেন, ‘হযরত! একটি দূর্লভ জিনিস সংগ্রহ করেছি। হযরত থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ছবি। আপনাকে দেখাতে চাই।’ আমি বললাম, এটাতো পুড়িয়ে ফেলা দরকার। ছবি তুলে সংরক্ষণ করা শরীয়ত অনুমোদিত নয়। তবে পাসপোর্ট বা অন্যান্য জরুরী প্রয়োজনে তোলা যেতে পারে।’

যুক্তি

হযরত বলেন, চামড়ার মোজা মাসেহ করতে পায়ের উপরের অংশে তিন আঙ্গুল দিয়ে মাসেহ করতে হবে। এটা শরীয়তের বিধান। কিন্তু যুক্তি দিয়ে বোঝানো যাবে না। বরং পায়ের নিচে মাসেহ করলে কিছু ধূলাবালি পরিষ্কার হত। ইসলামের সব হুকুম যুক্তির নিরিখে বিচার করা যাবে না।

তালিম

অফিসে কিভাবে তালিম করা যায় প্রশ্ন করাতে হযরত বললেন, এক মিনিটের মাদরাসা থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে পড়বে। বড়দের কথার মধ্যে নূর থাকে। এজন্য নিজ থেকে কথা না বলে, বড়দের কথা শুনিয়ে দেয়া ভাল।

কঙ্কর নিক্ষেপ

হযরত বলেন, ‘হজের সময় এক উচ্চ শিক্ষিত লোক তার স্ত্রীকে নিয়ে গেছেন। নিজে কঙ্কর মারার পর ভীড়ের কারণে তার স্ত্রী কঙ্কর মারতে পারেননি। তাই তিনি স্ত্রীকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে স্ত্রীর পক্ষ থেকে কঙ্কর মেরেছেন। আমাকে বলার পর আমি জবাব দিলাম, ‘আপনার কঙ্কর মারা হয়েছে, আপনার স্ত্রীরটা হয়নি।’ তিনি বললেন, ‘এটা কেমন কথা!’ আমার কথায় তিনি আশ্বস্ত হতে পারলেন না। তারপর আমি তাকে একজন বড় মুফতী সাহেবের কাছে নিয়ে গেলাম। মুফতী সাহেবও একই কথা বললেন। তখন তিনি বলে উঠলেন, ‘আপনারা মাওলানা সাহেবরা বেশি বাড়াবাড়ি করেন।’ দেখেন ইংরেজি শিক্ষিত দ্বীনদার লোকদের অন্তরে আলেমদের প্রতি কি প্রবল ঘৃণা! কচু পাতার পানি! একটু মনমত না হলেই আলেমদের প্রতি আমরা যারা ইংরেজি শিক্ষিত তাদের অবহেলা প্রকাশ পেয়ে যায়।’

নসিহত

সফরে যাওয়ার আগে হযরতের কাছে কিছু নসীহত চাইলাম। হযরত বললেন, সূরা আল আ’লা এর ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে আছে,

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا    وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ

‘না, বরং তোমরা তো আখেরাতের জীবনের বদলে দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়েছো। অথচ আখেরাতই উৎকৃষ্টতর এবং স্থায়ী।’ আখেরাতের জীবন সামনে রাখলেই, আমাদের কি কি করা উচিত তা আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়বে।

বিয়ের উপহার

হযরত বলেন, মেহমানের উপর কোন আর্থিক বোঝা চাপানো ঠিক না। সুতরাং বিয়ের অনুষ্ঠানে উপহারের প্রত্যাশা করা ঠিক না।

ওসিয়ত

হযরত বলেন, লাশ গ্রামে নিয়ে দাফন করার অসিয়ত মানা জায়েয নেই। কারণ, যেখানে মৃত্যু হয়েছে সেখানেই দাফন করার কথা শরীয়তে বলা হয়েছে।

প্রচলিত মীলাদ

প্রচলিত মীলাদের ভুলসমূহ আলোচনা করতে গিয়ে হযরত বলেন, অনেকে মীলাদে রাসূলের আলোচনার সময় দাঁড়িয়ে যায় এবং আল্লাহ পাকের আলোচনার সময় বসে থাকে। সুতরাং, এটা তো আল্লাহ র সাথে বেয়াদবী।

ছবি 

হযরত বলেন, ‘আমরা এক ছেলের বিয়েতে শরীক হলাম। সেখানে ছবি তোলা হচ্ছিল। ছবি তোলার এক পর্যায়ে আমি বললাম, ছবি তোলা যাবে না। তারা খুব ক্ষেপে গেল। বলল, ‘কেন, আপনারা ‘পাসপোর্ট’-এর জন্য ছবি তোলেন না?’ আফসোস! সাধারণ লোক এটা বুঝতে অক্ষম যে, তীব্র প্রয়োজন ছাড়া শরীয়ত ছবি তোলার অনুমতি দেয় না।’

Facebooktwitterpinterestmailby feather