Category Archives: Discourses (Bangla)

মসজিদের জামাত

হযরত বলেন, একবার হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হরদুই হযরত এশার নামায পড়ে এসে দেখলেন, দফতরে কয়েকজন মিলে জামাত করে নামায পড়ছে। পরদিনও একই অবস্থা। লালবাগ কিল্লার মোড়ে দাওয়াতুল হকের কার্যালয় ছিল। সেখান থেকে মসজিদ কিছুটা দূরে। সুতরাং নামাযের সময় হলে লোকেরা সেখানেই নিজেরা জামাত করে নামায পড়ে নিত। এটা দেখে হরদুই হযরত বলে উঠলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে জামাতের জন্য তাকীদ করেছেন, সেটা এই জামাত নয়। সেটা মসজিদের জামাত।

Facebooktwitterpinterestmailby feather

চোখের গোনাহ-২

একজন ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এসে বললেন, ‘আমি বিমানে চাকুরি করি। সেখানে আমার অনেক নারী সহকর্মী আছে। এ অবস্থায় আমি কীভাবে এই চাকুরি করব?’ হযরত বললেন, ‘নজর বাঁচিয়ে চলতে হবে। চাকুরি ছাড়া যাবে না।’ তারপর হযরত নিজের কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘একবার উদয়ন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে আমাকে মেম্বার বানানো হলো। কমিটিতে আমিই একমাত্র পুরুষ আর সব নারী।

আমি হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে এই অবস্থা জানালাম। হাফেজ্জী হুযুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাকে বললেন, ‘নজর বাঁচিয়ে কাজ করেন।’ তবু কমিটি ছাড়ার অনুমতি দিলেন না। আমি সেই কমিটিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। কখনো চোখ তুলে কোন মহিলার দিকে তাকাইনি।’

Facebooktwitterpinterestmailby feather

চোখের গোনাহ-১

হযরত বলেন, আমি হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে ১৯৭৪ সনের মে মাসে বাইআত হলাম। বাইআত করানোর সময় কিছু যিকির-আযকার বলে হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, ‘চোখের গোনাহ থেকে বাঁচেন।’ এটা আমার প্রতি হযরতের প্রথম নসিহত। এর মানে কি?

আমাদের দেশে একটা রীতি আছে, লোকেরা বলে : আতুর ঘর থেকে বের হবার পর যিনি আমাকে প্রথম কোলে নিয়েছেন, তিনি তো আমার চাচী। এই চাচীর সঙ্গে পর্দা লাগবে কেন? তার সঙ্গেও পর্দা জরুরী। পর্দা অনেক বড় একটি বিষয়। হরদুই হযরত বারবার বলতেন, ‘খালুকো লোগোনে আলু বানা দিয়া, লেকিন হায় ও ভালু।’ মানে, খালুর সাথে মেয়েরা পর্দা করে না। কিন্তু খালু আসলে ভাল্লুক। তার সঙ্গে পর্দা করতে হবে। দেবর, খালু, ফুপা—তাদের সঙ্গে পর্দা করার কথা আমারা চিন্তাই করি না।

Facebooktwitterpinterestmailby feather

হিজরত আর মুসআব ইবনে উমায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু

হযরত বলেন, আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করলেন। হিজরতের শুরু হলো কীভাবে? হিজরতের তিন বছর আগে মদীনার ছয়জন লোক মুসলমান হল। তার পরের বছর বারো জন মুসলমান হয়। তৃতীয় বছরে পঁচাত্তর জন মানুষ মদীনা থেকে এল। যে বছর বারো জন এসেছে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দরখাস্ত করল, ‘আমাদের কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য একজন মুয়াল্লিম দেন’। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাছাই করে তরুণ সাহাবী মুসআব ইবনে উমায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্বাচন করলেন। অনেক বড় বড় সাহাবীকে নির্বাচন না করে মদীনাবাসীদের অনুরোধে এই মুসআব ইবনে উমায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠালেন। তিনি গেলেন।

মদীনায় প্রথম যে ছয়জন মুসলমান হয়েছিলেন, আসআদ ইবনে জুরারা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের একজন। তার বাড়িতে মুসআব বিন উমায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু জায়গীর ছিলেন। মুসআব ইবনে উমায়েরের কাজ কী? কুরআন মাজীদ শেখানো। এজন্য তাকে বলা হয় মুকরী। যারা তিলাওয়াত করেন, তাদের বলা হয় কারী। যিনি অন্যকে কেরাত শেখান তাকে বলা হয় মুকরী। এক বছরে তার মেহনতে মদীনার মধ্যে ইসলাম অকল্পনীয়ভাবে আগে বেড়ে গেল। আউস গোত্রের সর্দার সাদ ইবনে মুআয এবং খাযরাজ গোত্রের সর্দার সাদ ইবনে উবাদা মুসলমান হয়ে গেল একই দিনে।

পরের বছর পঁচাত্তর জন মীনার ময়দানে আকাবায় শপথ নিলেন। অর্থাৎ হিজরতের তিন বছর আগে আল্লাহপাক মদীনায় একটা নুতন দিগন্তের সূচনা করেন যার ফলে মুসআব বিন উমায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআন শিক্ষক হিসাবে মদীনায় গমন করেন। আর তার এক বছর মেহনতের পরেই পরের বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করেন। তাহলে হিজরতের রাস্তা খুলল কীভাবে? মুসআব ইবনে উমায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহুর কুরআন শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে।

Facebooktwitterpinterestmailby feather

সূরা ফাতেহা

হযরত বলেন, আজকাল নতুন ফেতনা শুরু হয়েছে। মাযহাবের নামে মসুলমানদের ধোঁকা দেওয়া।

‘সূরা ফাতেহা পড়েন ইমাম সাহেবের পড়ার পর?’

‘না আমি কেন পড়ব? ইমাম সাহেবই তো পড়ছেন।’

‘আপনার নামায হয় না, এই যে দেখেন বুখারী শরীফের হাদীস।’

এটা আরেক শয়তানী। আমরা হানাফী মাযহাবের লোক। আমাদের কথা হচ্ছে, ইমাম সাহেবের কিরআত আমাদের কিরআত। এটা হাদীস থেকে বের করা। যারা জামাতে নামায পড়ছে তাদের বিধান হলো ইমাম সাহেবের এক্তেদা করা। আলাদা পড়ার দরকার নেই। এরা এসে আমাদের হানাফী মাযহাবের উপর  ধোঁকা দেয়। নাভীর নিচে কেন হাত বাঁধেন? উপরে বাঁধবেন। সব উল্টা পাল্টা কথা। যারা নামায পড়ে না, তাদের নামাযী বানানোর চেষ্টা নেই। যারা নামায পড়ে তাদের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। মতলবই খারাপ।

Facebooktwitterpinterestmailby feather

সরল সঠিক পথের পরিচয়

হযরত বলেন, সূরা ফাতেহায় আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ

আমাদের সরল সঠিক পথ দেখান।

তার পাশেই আছে,

صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ

তাদের পথ, যাদের উপর আপনার নেয়ামত বর্ষিত হয়েছে।

তারা কারা? তারা হলেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহীন। এটা আল্লাহ নিজেই বলেছেন,

وَمَنْ يُّطِعِ اللهَ وَالرَّسُوْلَ فَاُولٰئِكَ مَعَ الَّذِيْنَ اَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّيقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِيْنَ وَحَسُنَ اُولٰئِكَ رَفِيْقًا

আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং রাসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাদের সঙ্গী হবে। তারা হলেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহীন। আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।

 

আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে চালিত করেন।

Facebooktwitterpinterestmailby feather

আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে

হযরত বলেন, সূরা আর-রহমানের প্রথম আয়াত, الرَّحْمٰنُ ¬- মহা করুণাময়। দুই নম্বর আয়াত, عَلَّمَ الْقُرْاٰنَ – তিনি কুরআন শিখিয়েছেন। মহা করুণাময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ করুণা কী? কুরআন শিক্ষা দেওয়া। সূরা কামারে আল্লাহপাক চার বার একটা কথা বলেছেন :

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْاٰنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ

আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?

আয়াত নম্বর সতেরো, বাইশ, বত্রিশ এবং চল্লিশ। একই সূরায় চার চারবার একই আয়াত। আমি কুরআনকে বড় সহজ করে দিয়েছি নসিহত গ্রহণ করার জন্য। তিলাওয়াত করা, মূল নসিহতকে গ্রহণ করা অতি সোজা। আবার অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

أَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَ أَمْ عَلٰى قُلُوْبٍ أَقْفَالُهَا

তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?

তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? গভীরভাবে চিন্তার জন্য অনেক স্টাডি দরকার। উলামায়ে কেরাম বলেন, সূরা কামারে যে আল্লাহ বলেছেন, কুরআনকে সহজ করে দিয়েছেন, এর মানে কী? কুরআনের আয়াতের মোটামুটি অর্থ বোঝার জন্য কুরআন অদ্ভুত সহজ, তিলাওয়াতের জন্য অদ্ভুত সহজ।

এজন্য বলেছেন, فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ—আছে কেউ? আছে তোমার একটু সময়? আমি তোমাকে বানিয়েছি। তোমাদের রিযিক দেই। বাতাসে অক্সিজেন আমার দেওয়া। আকাশ থেকে পানি আমি দেই। জমিন থেকে ফসল আমি দেই। আমি নবীর মাধ্যমে কুরআন দিয়েছি। তোমার একটু সময় হবে?

আমাদের অঘোষিত জবাব, সরি আল্লাহ, আমার সময় নেই। মুখে বলি না; কিন্তু আসলে কর্মকান্ডে তা-ই। আল্লাহ, আমার অনেক কাজ। কুরআন নিয়ে অবসর নাই। এমন একটা ভাব—আল্লাহ, আপনি তো বোঝেন না, কত কাজে দৌড়াদৌড়ি করি! তবু ভালো, আল্লাহকে মানি। আল্লাহকে বিশ্বাস করি। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন।

Facebooktwitterpinterestmailby feather

আরবি উচ্চারণ

হযরত বলেন, ‘আমাদের বেশীর ভাগ ইংরেজি শিক্ষিত লোকের আযীম (اَلْعَظِيْمُ) উচ্চারণ সহীহ হয় না। বিসমিল্লাহীর রাহমানীর রাহীম বলার সময় বিসমিল্লাহ-এর লাম-এর উচ্চারণ বারিক বা (পাতলা) হবে।  অন্যদিকে আল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করার সময় লাম-এর উচ্চারণ পুর (মোটা) করে পড়তে হবে।’

Facebooktwitterpinterestmailby feather

গলদ আকিদা আর তার প্রতিকার

হযরত বলেন, হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হরদুই হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি দুজনই বার বার বলতেন, খাঁটি হক্কানী উলামায়ে কেরামের সাথে থাক। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করো। গলদ আকিদা সর্বনাশের জিনিস। আমলের কমি অত নিন্দনীয় না। গলদ আকিদা সর্বনাশের মূল কারণ। এখন জায়গায় জায়গায় মকতব প্রতিষ্ঠা করে খাটি আল্লাহ্‌ ওয়ালা ওস্তাদ দিয়ে সেগুলো চালানো খুব প্রয়োজন। যে শিশু ছোটবেলায় আকীদার মৌলিক জিনিসগুলো শিখবে, সে ইনশাআল্লাহ গলদ আকিদার পাল্লায় পড়বে না।

অজ্ঞতার রোগ বাহ্যিক পিটাপিটি করলে যাবে না। কাকরাইলের মুরুব্বি হাজি আব্দুল মুকিত সাহেব বার বার বলতেন, ‘অন্ধকার ঘরে লাঠি পেটালে অন্ধকার দূর হবে না। একটা ছোট মোমবাতি জ্বালাও।’ আল্লাহ্‌র দ্বিনের মৌলিক কাজঃ এক নম্বরে ফুরকানিয়া মকতব প্রতিষ্ঠা করা। আর দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে, জায়গায় জায়গায় দ্বীনি কথাবার্তার মজলিস চালু করা। ক্লাবে, মাঠে, স্কুলে, মাদরাসায়, ছোট ছোট মজলিসে খাঁটি উলামায়ে কেরামের নসিহত মানুষকে শোনানো দরকার।

Facebooktwitterpinterestmailby feather

আহবান শুনেছি, ঈমান এনেছি

হযরত বলেন, আজকে ক্কারী সাহেব ফজরের নামাযে কুরআন মাজীদের এক অপূর্ব জায়গা তিলাওয়াত করেছেনঃ

رَبَّنَاۤ اِنَّنَا سَمِعۡنَا مُنَادِيًا يُّنَادِىۡ لِلۡاِيۡمَانِ اَنۡ اٰمِنُوۡا بِرَبِّكُمۡ فَاٰمَنَّا

হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা এক আহবায়ককে ঈমানের দিকে আহবান করতে শুনেছি, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আন।’ সুতরাং আমরা ঈমান এনেছি।

অদ্ভুত কথা! আমরা এটাকে যাচাই বাছাই করতে যাইনি। আহবান শুনেই ঈমান এনেছি। সবাই স্বীকার করে যে, একজন প্রতিপালক আছেন। যারা আল্লাহ্‌কে বিশ্বাস করে না, তারাও স্বীকার করতে বাধ্য।

তুমি বাতাস থেকে যে অক্সিজেন নিচ্ছ, তা এই বাতাসের মধ্যে কে ভরে দিলেন? বিজ্ঞানীরা বলেন যে, আমাদের চারদিকে যে বাতাস, এটা একটা মিশ্রণ। বাতাস কোনো যৌগিক পদার্থ নয়। এই মিশ্রণের শতকরা ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন গ্যাস, ২১ ভাগ অক্সিজেন, ০.৯ ভাগ আর্গন। ১০০ ভাগের মধ্যে ৯৯.৯ ভাগ গেল, বাকি  থাকে ০.১ ভাগ। তার মধ্যে রয়েছে অন্যান্য গ্যাস। সারা দুনিয়া জুড়ে বাতাসে অক্সিজেন আছে। যদি এমন হতো –  বাংলাদেশ অক্সিজেনের পরিমাণ শতকরা ১৭ ভাগ,  আর আমেরিকাতে ২১ ভাগ। ডাক্তারগণ বলেন যে, তাহলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। বাতাস একটা মিশ্রণ হলেও সারা দুনিয়ায় এই মিশ্রণের অনুপাত একই রকম। যদি আপনাদের মধ্যে কয়েকজনকে চিনির সরবত বানাতে দেওয়া হয়, তাহলে সরবতে চিনির পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য হবে কি হবে না? বাতাসের মিশ্রণ সারা দুনিয়া জুড়ে এক। এটা কোনো মানুষের কাজ নয়, মহান প্রতিপালকের অনুগ্রহ।

'প্রফেসর হযরতের মালফুযাত '- হতে সংগৃহীত
Photo credit:  Ali Arif Soydaş on Unsplash
Facebooktwitterpinterestmailby feather