Tag Archives: হরদুঈ হযরত

মালফুযাত সংকলন-৩

কুরআন সহিহ করে পড়া

হযরত বলেন, একবার হরদুঈ হযরত বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ আলেমকে সূরা ইনশিরাহ পাঠ করে শোনাতে বললেন। পড়া শুনে বললেন, ‘পাস তো হায়, লেকিন ফার্স্ট ডিভিশন নেহি।’ সুবহানাল্লাহ! হরদুঈ হযরতের মানদন্ড কত সূক্ষ্ম ছিল! একজন বিখ্যাত আলেমের পড়া যদি হযরতের মানদন্ডে এমন হয়, তবে অন্যদের কি অবস্থা! কুরআন সহীহ করে পড়া রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সবচেয়ে বড় সুন্নাত। অথচ আজ এই সুন্নাতের উপর আমাদের কত অবহেলা!’

আলেমদের খাদেম হও

হযরত বলেন, আমার কাছে প্রায়ই অনেক উচ্চশিক্ষিত ছেলেরা আসে। স্কুল-কলেজে ভালো রেজাল্ট করেছে। মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েটে ‘এ+’ পেয়েছে। তারা এসে বলে, ‘স্যার, আমি আলেম হতে চাই।’ আমি বলি, ‘তোমাদের আলেম হবার বয়স নেই। তোমরা আলেমদের খাদেম হও। এটা সহজ।’

চাঁদা

একটি মাদরাসায় সফর ছিল। সাথে দুই-তিনজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন। মাদরাসাটিতে বোর্ডিং-এর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এজন্য ছাত্র উস্তাদদের খুব কষ্ট হচ্ছিলো। তাই হযরতের উপস্থিতিতে একজন লোক এসব ধনী ব্যক্তিদের থেকে চাঁদা আদায়ের জন্য চাপ দিতে চাচ্ছিল। হযরত নিষেধ করলেন। বললেন, হরদুঈ হযরত মানুষকে সামাজিক চাপে ফেলে চাঁদা আদায় করতে নিষেধ করতেন।

দেখাদেখি কারতে হেঁ, পুছতে নেহি

হযরত বলেন, হরদুঈ হযরত বলতেন, ‘দেখাদেখি কারতে হেঁ, পুছতে নেহি। উলামাসে পুছো।’ সাধারণ মানুষ একে অন্যকে দেখে আমল করে, আলেমদের জিজ্ঞেস করে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

১৬:৪৩

অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তোমাদের জানা না থাকে; ‘আয়াতে বলা হয়েছে, যিকিরকারীদের জিজ্ঞেস কর। আমি এটাকে সহজ করে বলি, মৌলবীদের জিজ্ঞেস করেন।’

দ্বীনি মজলিসের দুটি ফায়দা

হযরত বলেন, হরদুঈ হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, ‘দ্বীনি মজলিসে বসার দুটি ফায়দা। ইলমী ও আমলী। কেউ যদি দূর থেকে মাইকে বয়ান শোনে, মজলিসে হাজির না হয়, তবে সে ইলমী ফায়দা পাবে। কিন্তু আমলী ফায়দা থেকে বঞ্চিত থাকবে। মজলিসে বিভিন্ন ধরনের লোক থাকে। কারো মধ্যে বিনয় বেশি, কারো মধ্যে আল্লাহ তা’আলার ভয় বেশি। মজলিসে হাজির হলে এক অন্তর অন্য অন্তর থেকে নূর গ্রহণ করে। এভাবে অন্তরসমূহ আলোকিত হয়ে যায় এবং আমলের তাওফীক হয়।

 

ঐদিনকে ভয় কর

 

হযরত বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে সৌভাগ্য দিয়েছিলেন হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির খাদেম হয়ে ঘোরার। হযরত জায়গায় জায়গায় বারবার এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন,

وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ

مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ ২:২৮১

‘তোমরা ঐদিনকে ভয় কর, যেদিন তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে আল্লাহ তায়ালার কাছে। অতঃপর তোমাদের বুঝিয়ে দেয়া হবে, যা সে অর্জন করেছিল। তদের উপর কোনই জুলুম করা হবে না ।’

অতি সহজ-সরল অর্থ। ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমাকে ফিরিয়ে নেয়া হবে আল্লাহ তা’আলার কাছে। অতঃপর আল্লাহ বুঝিয়ে দেবেন কি আমল করেছিলে। কি অর্জন করেছিল। সবাই দুনিয়ার সাফল্যকে অর্জন বলে। এটা সেই অর্জন না। যারা দুনিয়া অর্জনের পিছনে দৌঁড়ায়, তারাও বলে এই অর্জন তাদের সাথে কবরে যাবে না। টাকা পয়সা পদমর্যাদা ডিগ্রী কি সাথে যাবে? যাবে না। আল্লাহ  তা’আলা অহীর মাধ্যমে যুগে যুগে নবীদের মাধ্যমে জানিয়েছেন, এটা দুনিয়ার কোনো জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণার মাধ্যমে বের করা যাবে না

সুন্নাতকে আকড়ে ধরো

হযরত বলেন, হরদুঈ হযরত বলতেন, ‘যেসব সুন্নাত নিয়ে কোন মতপার্থক্য নেই, ঝগড়া-ঝাটি নেই, সেগুলো আমল কর। বেশি বেশি যিকির কর। সুবহানাল্লাহ, আল্লাহু আকবার বেশি পড়।’ হরদুঈ হযরতকে বলা হয়, মুহিউস সুন্নাহ। তার প্রধান কথাই ছিল সহজ সুন্নাতগুলোকে  আমলে আনো। ধীরে ধীরে আগে বাড়ো। তিনি আরও বলতেন, ‘আমরা সবাই নেককার হতে চাই। আর এর তরীকা হল সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা।’

Facebooktwitterpinterestmailby feather

মালফুযাত সংকলন – ২

আমাদের আদর্শ রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এবং তাঁর সাহাবিরা

হযরত বলেন, সৌদি আরবের অনেক লোক টাখনুর নীচে কাপড় পরে, কেউ কেউ দাড়ি ছোট করে ফেলে ইত্যাদি অনেক অভিযোগ হযরত হাফেজ্জী হুযুুর রহমাতুল্লাহি  আলাইহির কাছে বলা হত। জবাবে তিনি বলতেন, ‘আরবের লোকেরা আমাদের আদর্শ নন। আমাদের আদর্শ তো রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম। সুতরাং আমরা তো সাহাবায়ে কেরামদের অনুসরণ করব।

গরিব আলেমের দরবারে

একজন বড় শিল্পপতি আসলেন হযরতের সাথে দেখা করতে। হযরত তাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, ‘আমি একবার বুয়েটের ভিসি সাহেবকে নিয়ে হযরত হাফেজ্জী হুযুুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে গেলাম। তিনি একটি আরবী কবিতা বললেন, যার অর্থ হল-‘কতই না উত্তম সেই আমীর যে নিজের আমীরত্বকে মিটিয়ে গরীব আলেমের দরবারে আসে।’

‘পুলিশ নাইক্কা’

হযরত বলেন, ‘হাফেজ্জী হুযুুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির দাওয়াতে হরদুঈ হযরত রহমাতুল্লাহি  আলাইহি ১৯৮১ সনে বাংলাদেশ সফরে আসলেন।  প্রথম দিন আমি হযরতকে নিয়ে প্রাইভেট কারে লালবাগ যাচ্ছিলাম। রাত সাড়ে নয়টা। আজিমপুর গোরস্থানের কাছে চৌরাস্তার ট্রাফিক সিগনালে লাল বাতি জ্বলে আছে। ড্রাইভার এদিক-ওদিক দেখে লাল সিগনালের মধ্যেই গাড়ি চালিয়ে দিল। হরদুঈ হযরত বলে উঠলেন, ‘আরে ভাই! লাল বাত্তি হায়, রোখতে নেহি।’ ড্রাইভার বলল, ‘পুলিশ নাইক্কা।’ ড্রাইভারের কথা হল, পুলিশ নেই, ধরবে কে? হযরত বাংলা জানতেন না। আমি উর্দূতে ব্যাখ্যা করলাম। হযরত নীরব হয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বলে উঠলেন, ‘হাঁ ভাই! ইসি লিয়ে কাহা জাতা হায়, ইলম কাফি নেহি, তাকওয়া চাহিয়ে।’ অর্থাৎ, হ্যাঁ ভাই, এজন্য বলা হয় যে, ইলম যথেষ্ট নয়, তাকওয়া চাই। এই কথাটা আলেমদের জন্য হাদিয়া দিলাম। বাংলাদেশে হযরতের প্রথম রাতের বিখ্যাত কথা। ইলম যথেষ্ট নয়, আল্লাহর ভয় চাই।’

সালাম

হযরত বলেন, ‘১৯৮০ থেকে ২০০৪ সাল এই চব্বিশ বছর পর্যন্ত হরদুঈ হযরতকে আমরা বাংলাদেশে পেয়েছি। সবসময় সালাম সম্পর্কে বলতেন। সালাম রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অতি প্রিয় একটি সুন্নাত। মদীনা শরীফে হিজরতের পরে প্রথম ভাষণে বললেন, أَفْشُوا السَّلَامْ , সালামের বহুল প্রচার কর। সমাজে প্রচলিত হয়ে গেছে- স্লামালাইকুম। বলতে হবে, আসসালামু আলাইকুম। এর প্রথম অক্ষর আলিফের উপর যবর। আমরা ছোট বেলায় পড়েছি আলিফ, বে, তে, ছে। উলামায়ে কেরাম বলেন, আলিফ, বা, তা, ছা। আলিফের উপর যবর, যের, পেশ হলে এটা হয়ে যায় হামযাহ। আলিফের উপর যবর দিলে পড়তে হবে হামযাহ যবর আ।’

সুন্নত তরিকায় নামায

হযরত বলেন, হরদুঈতে বছরের প্রত্যেক দিনই নামাযের পর রুকুতে যাওয়া শেখানো হয়। সিজদায় যাওয়ার সময় হাঁটু মাটিতে লাগার পূর্ব পর্যন্ত কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত সোজা থাকবে। রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো ওয়াজিব। দুই সেজদার মাঝে স্থির হয়ে বসা ওয়াজিব।

‘গাড়ি লেকে জান্নাত মে নেহিঁ জাওগি’

হযরত বলেন, ধানমন্ডিতে হাজী হাবীব সাহেবের বাসায় একবার আমরা হরদুঈ হযরতের খেদমতে ছিলাম। নামাযের ওয়াক্ত হল। মসজিদ কিছুটা দূরে হওয়ায় ঘরেই জামাত করে নামায পড়বার প্রস্তুতি চলছিল। হযরত জিজ্ঞেস করলেন যে, গাড়ী নিয়ে মসজিদে যেতে কতক্ষণ লাগবে? বলা হল, দুই-তিন মিনিট। হরদুঈ হযরত বললেন, ‘গাড়ি লেকে জান্নাত মে নেহিঁ জাওগি?’ অর্থাৎ গাড়ি নিয়ে দুনিয়ার সবকাজে যেতে পারো। আর দুনিয়ায় জান্নাতের বাগিচা মসজিদে জামাতে যেতে চাও না!

হরদুই হযরতের সুন্নতের পাবন্দি

হযরত বলেন, হরদুঈ হযরত ছিলেন সুন্নাতের সাচ্চা আশেক। ২০০৪ সালে বাংলাদেশে হযরতের শেষ সফরে তিনি এত দূর্বল ছিলেন যে, উঠে বসতেও পারতেন না। এজন্য গাড়ির পেছনে চৌকি রেখে হযরতকে শোয়ানো অবস্থায় সফর করানো হত। একবার একজন খাদেম ভুলে আগে ডান পা থেকে জুতা খুলে ফেলে। হযরত বললেন, ‘আহ্! কে সুন্নাতের খেলাফে ডান পায়ের জুতা আগে খুললো?’ হযরতের নির্দেশে তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে পুনরায় জুতা পরানো হল। আবার গাড়িতে উঠানো হল এবং সুন্নাত অনুযায়ী আগে বাম পা থেকে জুতা খোলা হল। একটি সুন্নাতের উপর আমল করার জন্য তিনি এই অকল্পনীয় তাকলীফ বরদাশত করলেন।

‘সালাম ঠিকসে দি জিয়ে। হামযা না ছোটে’

হযরত বলেন, আমরা একবার হযরতের সঙ্গে দেখা করার জন্য হরদুঈ গেলাম। হরদুঈ হযরত অসুস্থ ছিলেন। ঘরের বাইরে বার-তের বছরের একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। হযরতের সাথে যারাই দেখা করতে যাচ্ছে তাদেরকেই সে বলছে, ‘সালাম ঠিকসে দি জিয়ে। হামযা না ছোটে।’ রোগীর জন্য এই দু’আ পড়বেন,

اَسْاَ لُ اللهَ الْعَظِيْمَ رَبَّ الْعَرْشِِ الْعَظِيْمِ اَنْ يَّشْفِيَكَ

‘আমি মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি যিনি আরশে আযীমের অধিপতি যেন তিনি তোমাকে সুস্থতা দান করেন।’

  • ‘আত্মশুদ্ধির পাথেয়’  বইটি হতে সংগৃহীত
Facebooktwitterpinterestmailby feather